
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর এক ধরণের অলিখিত প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই অবস্থান ধরে রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আইএমএফ-এর ভর্তুকি কমানোর শর্ত—সব মিলিয়ে সরকার এখন বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের পথে হাঁটছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রাহক পর্যায়ে ৭.৮ থেকে ২০.১১ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, জনগণের ওপর বোঝা না চাপিয়ে কি ভর্তুকি কমানোর অন্য কোনো উপায় নেই?
উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর একমাত্র সমাধান দাম বাড়ানো নয়। বরং উৎপাদন খরচ কমিয়েও এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভর্তুকির বড় একটি অংশ কেন এবং কোথায় ব্যয় হচ্ছে, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।
ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা: বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যে বিপুল পরিমাণ 'ক্যাপাসিটি চার্জ' দিতে হয়, তা সরকারি কোষাগারে বড় চাপ তৈরি করছে। এই চার্জের যৌক্তিক সংস্কার করা গেলে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
জ্বালানি আমদানিতে সাশ্রয়: আমদানিকৃত এলএনজি বা তেলের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমাবে।
সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনা: বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় চুরি ও কারিগরি ত্রুটিজনিত যে সিস্টেম লস হয়, তা রোধ করতে পারলে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়া সম্ভব।
আইএমএফ-এর ঋণের অন্যতম শর্ত হলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা। তবে বারবার দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম অস্থির, তখন অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা দূর না করে কেবল দাম বাড়ানোকে স্থায়ী সমাধান মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় গ্রাহকের পকেট থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করা, নতুবা বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দাম না বাড়িয়েও বিদ্যুৎ খাতের এই লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সূত্র: উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা ও সাম্প্রতিক সরকারি প্রতিবেদন।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।